সুনামগঞ্জ , বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ , ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সুনামগঞ্জে দুর্গাপূজার নিরাপত্তাব্যবস্থা সন্তোষজনক: সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি সাংবাদিক আলিফ হত্যা ও মোত্তালিব ভূঁইয়ার ওপর হামলার প্রতিবাদে সুনামগঞ্জে মানববন্ধন দিরাইয়ে মাদকবিরোধী সভার পর প্রবাসী লিমনের ওপর হামলার অভিযোগ ‎সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ি : প্রধানমন্ত্রী ‎সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই : আইনমন্ত্রী শান্তিগঞ্জে ১৬২ কেজি মাছের পোনা অবমুক্ত ‎মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক দুর্গাপূজা উপলক্ষে পশ্চিম নতুনপাড়ায় ৮৮ প্রবীণকে সম্মাননা দিরাইয়ে মোটরবাইক দুর্ঘটনায় আহত ২ সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে সুনামগঞ্জে মানববন্ধন, খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি সুনামগঞ্জে দুই যুব সংগঠন পেল ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা অনুদান দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকার নিশ্চিতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ : রাষ্ট্রপতি দুর্গাপূজার শুভেচ্ছাবার্তায় প্রধানমন্ত্রী ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার দুর্গাপূজায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, মাঠে তৎপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সুনামগঞ্জে এসআরবি উইং কমান্ডার দুর্গাপূজায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত ছেলের হাতে মা খুন সীমান্তবর্তী পূজামন্ডপের নিরাপত্তায় ৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সুনামগঞ্জে সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা সহ্য করা হবে না : এমপি নূরুল ইসলাম পতিত জমিতে মাল্টার বাগান, প্রবাসফেরত সাইফুরের সাফল্য

যাদুকাটা থেকে পাটলাই : নদী লুটের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কি জাগবে?

  • আপলোড সময় : ১৩-০৮-২০২৬ ০৬:২৯:৫০ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৩-০৮-২০২৬ ০৬:৩০:২২ পূর্বাহ্ন
যাদুকাটা থেকে পাটলাই : নদী লুটের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কি জাগবে?
রাসেল আহমদ::
যাদুকাটা নদী নিয়ে গত কয়েক বছরে অসংখ্য সংবাদ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। শুধু যাদুকাটা নয়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা পাটলাই, ধোপাজান, মাহারাম, শান্তিপুর কিংবা চেলা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীর পাড় কাটা এবং পরিবেশবিধ্বংসী ড্রেজিংয়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা। স্থানীয় জনসাধারণ মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রশাসনকে স্মারকলিপি দিয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বহুবার সতর্ক করেছে। অবশ্য প্রশাসনও মাঝেমধ্যে এসব নদীতে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। বাস্তবতা হলো, এতে হয়রানির শিকার হয়েছে নিরীহ শ্রমজীবী মানুষজন। কিন্তু নদীগুলোতে বালু-পাথর লুটের সংঘবদ্ধ তৎপরতা থামেনি; আরও সংগঠিত ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে বালুখেকোর দল। প্রশ্ন হলো আইন আছে, আদালতের নির্দেশনা আছে, জনগণের চাপও আছে; তারপরও কেন নদীগুলোকে রক্ষা করা যাচ্ছে না? কেন থামানো যাচ্ছে না বালুখেকোদের দৌরাত্ম্য? যাদুকাটা একসময় ছিল স্বচ্ছ, শীতল ও জীবন্ত একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা এই নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, পর্যটন, কৃষি, মৎস্যস¤পদ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু কয়েক দশকের নিয়ন্ত্রণহীন বালু-পাথর উত্তোলন, ড্রেজিং এবং নদীর পাড় কেটে বালু সংগ্রহের ফলে নদীটি আজ ভয়াবহ অস্তিত্বসংকটে। একসময় যে নদীর প্রস্থ ছিল গড়ে ৫৭ মিটার, তা এখন কোথাও কোথাও বেড়ে গিয়ে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। এই বিস্তৃতি প্রাকৃতিক নয়; এটি নদীর পাড় খুবলে খাওয়া বালুখেকো মানুষের তৈরি। রাতের অন্ধকারে ড্রেজার, বোমা মেশিন ও সেইভ মেশিনের সাহায্যে নদীর বুক এবং পাড় কেটে প্রতিদিন হাজারও নৌকায় বালু তোলা হচ্ছে। এর ফলে নদীর দুই পাশের তীরবর্তী ঘাগটিয়া, মানিগাঁও, লামাশ্রম, রাজাগাঁও, সোহালা, বারিক্কাটিলা, লাউড়েরগড়, বিন্নাকুলি, গড়কাটিসহ অন্ততপক্ষে বিশটি গ্রাম ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি ও গাছপালা। এই ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হতে চলেছে বিশ্বখ্যাত শিমুল বাগানসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, নির্মাণাধীন সেতু এবং সরকারি অবকাঠামো। বহু পরিবার ইতোমধ্যে ভাঙনের আশঙ্কায় নিজেদের ঘরের টিন, কাঠ ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এটি শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদার সংকটও বটে। এই সংকটকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাহিরপুরের পাটলাই, মাহারাম ও শান্তিপুর নদীতেও একই চিত্র। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ড্রেজার বসিয়ে প্রকাশ্যে নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, নদীতীরবর্তী বসতি এবং ভাটি অঞ্চলের বহু হাওরের কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। কিছুদিন আগে একই অঞ্চলের ধোপাজান নদীতেও একইভাবে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত অংশগ্রহণে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হলেও থামেনি নদীর বুকে বালুখেকোদের আগ্রাসন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নদী লুটের এই অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্কের অভিযোগ প্রায় সর্বত্রই উঠে আসছে। স্থানীয় মানুষের ভাষ্য, ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের ছত্রচ্ছায়া ছাড়া এমন প্রকাশ্য তৎপরতা দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি, হামলা কিংবা সামাজিকভাবে হয়রানির আশঙ্কাও তৈরি হয়। ফলে অনেকেই নীরব থাকতে বাধ্য হন। যখন কোনো সমাজে আইনের শাসনের বদলে প্রভাবশালীদের প্রভাব কার্যকর হয়ে ওঠে, তখন পরিবেশ রক্ষা কেবল প্রশাসনিক নয়, রাষ্ট্রীয় সুশাসনেরও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। প্রশাসনের বক্তব্যও অনেক সময় হতাশাজনক। কোথাও আদালতের আদেশের ব্যাখ্যা দিয়ে অভিযান সীমিত রাখার কথা বলা হয়, কোথাও আবার পুলিশ জানায় যে নদীর পাড় কাটা বন্ধ করা তাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। জেলা প্রশাসন যৌথ অভিযানের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তা কতটা ধারাবাহিক ও কার্যকর হচ্ছে, ওই প্রশ্ন থেকেই যায়। বিচ্ছিন্ন অভিযান, কয়েকটি ড্রেজার ধ্বংস কিংবা সামান্য জরিমানা দিয়ে একটি সুসংগঠিত অবৈধ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পুলিশি তৎপরতা জোরদার এবং কোস্টগার্ড মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও কেবল বিশেষ বাহিনীর অভিযান দিয়ে চলমান সংকটময় পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হবে বলে মনে হয় না। স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত, স্বচ্ছ এবং দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা নীতি। এখানে নীতিগত দুর্বলতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। নদী ব্যবস্থাপনায় একাধিক সংস্থার দায়িত্ব থাকলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের ¯পষ্ট ঘাটতি দৃশ্যমান। কোথাও ইজারা, কোথাও পরিবেশগত বিধিনিষেধ, কোথাও আদালতের নির্দেশ; সব মিলিয়ে এমন এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র। বৈধ উত্তোলন, অবৈধ উত্তোলন এবং নৌপথ ব্যবস্থাপনার সীমারেখাও অনেক ক্ষেত্রে অ¯পষ্ট থেকে যাচ্ছে। এই অ¯পষ্টতা দুর্নীতি ও অপব্যবহারের সুযোগ বাড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি পাটলাই নদীতে বিআইডব্লিউটিএ-এর টোল আদায় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের একাংশের অভিযোগ, গেজেট ও বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে অতিরিক্ত চার্জ আদায় করা হচ্ছে। আবার ইজারার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার যুক্তিতে টোলের হার প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও বিতর্ক তৈরি করেছে। যদি সরকারি বিধিমালার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় হয়, তাহলেও আইনের শাসনের ওপর প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে। কারণ অবৈধ বা অযৌক্তিক ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের ওপরই চাপ সৃষ্টি করে। তাই বৈধ রাজস্ব আদায় এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ উভয় বিষয়ই স্বচ্ছভাবে তদন্ত ও নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলো রক্ষা মানে শুধু প্রাকৃতিক স¤পদ সংরক্ষণ নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, পর্যটন, জলবায়ু অভিযোজন এবং সীমান্ত অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। যাদুকাটা, পাটলাই কিংবা ধোপাজান ধ্বংস হলে ক্ষতি শুধু কয়েকটি গ্রামের হবে না; ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো হাওরাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে হাওরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্যস¤পদ এবং ভূপ্রকৃতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখন প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। অবৈধ ড্রেজিংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত যৌথ অভিযান, নদীর পাড় কাটা স¤পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি, অবৈধ খনন যন্ত্রপাতি স্থায়ীভাবে জব্দ, পরিবেশ আদালতে দ্রুত বিচার এবং জড়িত ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একটি সভ্য রাষ্ট্রে নদী কেবল খনিজ স¤পদের উৎস নয়; নদী একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা, যা মানুষ, প্রকৃতি ও অর্থনীতিকে একসূত্রে বেঁধে রাখে। যাদুকাটা, পাটলাই কিংবা ধোপাজানের আর্তনাদ আজ শুধু কয়েকটি নদীর নয়; এটি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নদীনির্ভর হাওরজনপদের সম্মিলিত আর্তনাদ। ওই আর্তনাদ যদি রাষ্ট্র এখনও শুনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। এসব নদী হারালে শুধু বালু-পাথর নয়, হারিয়ে যাবে এ অঞ্চলের ইতিহাস, জীবিকা, প্রকৃতি এবং মানুষের ভবিষ্যৎও।
(সংকলিত)
[রাসেল আহমদ, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী]

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সুনামগঞ্জে দুর্গাপূজার নিরাপত্তাব্যবস্থা সন্তোষজনক: সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি

সুনামগঞ্জে দুর্গাপূজার নিরাপত্তাব্যবস্থা সন্তোষজনক: সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি